Notice: Function _load_textdomain_just_in_time was called incorrectly. Translation loading for the all-in-one-seo-pack domain was triggered too early. This is usually an indicator for some code in the plugin or theme running too early. Translations should be loaded at the init action or later. Please see Debugging in WordPress for more information. (This message was added in version 6.7.0.) in /home/devsarabangla/public_html/wp-includes/functions.php on line 6170

Notice: Function _load_textdomain_just_in_time was called incorrectly. Translation loading for the cps domain was triggered too early. This is usually an indicator for some code in the plugin or theme running too early. Translations should be loaded at the init action or later. Please see Debugging in WordPress for more information. (This message was added in version 6.7.0.) in /home/devsarabangla/public_html/wp-includes/functions.php on line 6170

Notice: Function _load_textdomain_just_in_time was called incorrectly. Translation loading for the sarabangla4 domain was triggered too early. This is usually an indicator for some code in the plugin or theme running too early. Translations should be loaded at the init action or later. Please see Debugging in WordPress for more information. (This message was added in version 6.7.0.) in /home/devsarabangla/public_html/wp-includes/functions.php on line 6170
গৃহহীন হরিজনদের উচ্ছেদ এবং রাষ্ট্রের দায়
Wednesday 03 Jun 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

গৃহহীন হরিজনদের উচ্ছেদ এবং রাষ্ট্রের দায়

অমিত বণিক
২২ জুন ২০২৪ ১৩:৪৭

শহরকে পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর রাখতে যারা কাজ করছে ওই হরিজনদের এই শহরে হয় না মাথা গোঁজার ঠাঁই। যারা গত কয়েকশ বছর ধরে সবচেয়ে বড় সেবা দিয়ে ঝকঝকে-চকচকে শহর বানাচ্ছে তারাই নাকি এখন বড্ড বেমানান এ শহরে। তাই তো তাদের সরিয়ে বহুতল বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ করার নানা পরিকল্পনা চলছে মহাসমারোহে।

গভীর রাতে নানা অপরাধীর মুখোমুখি হয়ে মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে কাজ করা এসব হরিজনদের নূন্যতম বাসস্থান দেওয়ার সদিচ্ছা কি রাষ্ট্রের নেই। একই মানুষ, একই রক্ত, একই স্থানে বেড়ে ওঠা, একই দেশের নাগরিক, একই রাস্তায় হাঁটাচলা তবুও এত কেন ভেদাভেদ তাদের নিয়ে? ঘরে ঘরে, পরিবারে পরিবারে, সমাজে সমাজে বিরাজমান নানা বৈষম্যের মাঝেও আলাদা করে কেন চিহ্নিত কার হয় তাদের? কেন বার বার কেড়ে নেওয়া হয় তাদের বাসস্থানের অধিকার? গোটা শহরকে যারা সাফ ও সুন্দর করে রাখেন, তারাই কিনা এখন সবচেয়ে নোংরা-অপরিষ্কার, অসুন্দর ও অপবিত্র! যুগের পর যুগ ধরে বাস করা এসব মানুষের ভোটার আইডি থেকে শুরু করে স্থায়ী ঠিকানার সব কাগজ জুটলেও, জোটেনি কেনো বাস্তবিক আবাসনের ঠিকানা?

বিজ্ঞাপন

ভূমিহীন ও নিজস্ব বসতভিটাহীন হরিজন সম্প্রদায় বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে স্থানীয় সরকার প্রদত্ত জমি, রেলস্টেশনসহ সরকারি খাসজমিতে বসবাস করে আসছে প্রায় চারশ বছর ধরে। উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের নামে পুনর্বাসন ছাড়া তাদের উচ্ছেদ করা হচ্ছে খুব সহজে। যার প্রত্যক্ষ উদাহরণ রাজধানীর বংশালের আগাসাদেক রোডে হরিজন সম্প্রদায়ের বসতি মিরন জল্লা কলোনিতে উচ্ছেদ অভিযান। ভয় ভীতি ও প্রশাসনিক চাপ প্রয়োগ করে উচ্ছেদে বাধ্য করছে প্রশাসন। হরিজনরা এত বছর ধরে একই জায়গায় থাকার কারণে সেখানে গড়ে উঠেছে তাদের আলাদা এক সংস্কৃতি, ভিন্ন এক সভ্যতা ও জগৎ। সংবিধানই হওয়ার কথা ছিল এসব মানুষের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষায় রক্ষাকবচ, কিন্তু যে বাস্তবতা আমরা দেখতে পাই, তাতে আমাদের হতাশ হতে হয়।

বিজ্ঞাপন

হরিজনরা দীর্ঘদিন ধরে সরকারের কাছে দাবি করে আসছে তাদের প্রকৃত পুনর্বাসনের জন্য। তাদের অন্যত্র চলে যেতে কোনো আপত্তি নেই কিন্তু বিকল্প বাসস্থান ছাড়া তাদের আবার বাঁচারও উপায় নেই। সরকার একদিকে গরীব-দুঃস্থ ভুমিহীনদেরকে আশ্রয়ন প্রকল্পের আওতায় গ্রামে গ্রামে ঘর উপহার দিচ্ছে, কিন্তু খোদ রাজধানীতে কেনো এর উল্টো চিত্র? যাদের ইতোমধ্যে ঠিকানা আছে, তাদের কেন আশ্রয়হীন করা হচ্ছে? রাজধানীর মিরন জল্লাতে এই উচ্ছেদের সিদ্ধান্তে কষ্টের দিন কাটাচ্ছে শিশু-বৃদ্ধ নর-নারী থেকে প্রায় ১০ হাজার মানুষ। এমন সব অমানবিক উচ্ছেদ অভিযান দিয়ে কেন বারবার শিরোনামে আসতে চাচ্ছে প্রশাসন, এটি এখন বড় প্রশ্ন।

হরিজনরা অর্থনৈতিক দুর্দশা, সামাজিক ও মানবিক মর্যাদার দিকসহ নানাভাবে বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছে যুগের পর যুগ। মৌলিক অধিকার থেকে শুরু করে ছেলেমেয়েদের বিভিন্ন স্কুলে ভর্তি করানো, স্কুল ড্রেস পরা থাকলেও কাগজে নাস্তা দেওয়া, ময়লা পাত্রে পানি দেওয়া কিংবা হোটেলের বাইরে বসে খেতে দেওয়া, এমন সব মধ্যযুগীয় ঘটনার সাক্ষী হচ্ছে তারা প্রতিনিয়ত। রোহিঙ্গা কিংবা বিহারিদের এদেশে বিশেষ সুবিধায় পুনর্বাসন হলেও ভাগ্যদেবী সহায় হয় না এদের কিছুতেই। শত শত বছর ধরে এমনই নির্মোহ বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন তারা। দুইবার মানচিত্র বদলেছে, দেশভাগ হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে, নতুন সংবিধান হয়েছে তবুও তাদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলো না একবারও। আমাদের জাতির পিতার স্বপ্ন ছিল বাংলাদেশ হবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের মডেল, যেখানে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসনের পাশাপাশি থাকবে মৌলিক মানবাধিকারও। এখন এসব গৃহহীন হরিজনদের উচ্ছেদ অভিযান কি রাষ্ট্র তথা সরকারের জন্যও বড় লজ্জার ব্যাপার না?

বাংলাদেশে হরিজন বলে সাধারণত আমরা ব্রিটিশ আমলে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, পয়োনিষ্কাশন, চা–বাগান, রেলের কাজসহ প্রভৃতি কাজের জন্য ভারতের নানা অঞ্চল থেকে নিয়ে আসা দরিদ্র ও দলিত জনগোষ্ঠীকে বুঝি। এরপর থেকে কয়েক প্রজন্ম ধরে এই ভূখণ্ডে বসবাস করছে তারা। এদেশে হরিজনদের প্রধান পেশা মূলত সুইপারের কাজ করা। তাদের বেতন কম, ইনক্রিমেন্ট নেই, পেনশনও নেই। বর্তমান সরকার সব শ্রেণির মানুষের জন্য এ কাজটির সুযোগ করে দেওয়ায় এই পেশাও হারাতে বসেছেন তারা অনেকেই। ফলে অনেক মানবেতর দিন কাটাচ্ছে তারা।

হরিজনদের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় মহাত্মা গান্ধী ১৯৩৩ সালে সমাজে অস্পৃশ্য বলে বিবেচনা করা লোকদের হরিজন নামে নামকরণ করেন পুনা চুক্তির পর। হরিজনের অর্থ হচ্ছে হরি বা ভগবানের লোক। কিন্তু হরিজন শব্দটিকে পরে মর্যাদাহানিকর এবং অনুপালক বলে বিবেচনা করা হয় এই উপমহাদেশে।

বাংলাদেশে পরিচ্ছন্ন পেশায় নিয়োজিত বাঁশফোড়, হেলা, লালবেগী, ডোমার, রাউত, হাঁড়ি, ডোম (মাঘাইয়া) ও বাল্মিকী এ আট জাতের জনগোষ্ঠীকে হরিজন বলা হয়। সমাজের রীতি-নীতি, রাষ্ট্রীয় কাঠামো, পরিচালন পদ্ধতি পরিবর্তনের পাশাপাশি দলিত শ্রেণিভুক্ত পেশা বা গোষ্ঠীর শিরোনামও পরিবর্তন হয়ে আসছে। হিন্দু সমাজে বর্ণ বিভাজনের ক্রমশ বিলুপ্ত ঘটছে বটে, তবে শোষণ আর নিপীড়ন প্রক্রিয়া সচল থাকার কারণে উদ্ভব ঘটছে নতুন বিভাজনের। এ বিভাজন নির্দিষ্ট কোনো জনগোষ্ঠীর সীমারেখায় মধ্যে নয় বরং উৎপত্তি ঘটছে সর্বক্ষেত্রে।

২০১৩ সালে মাযহারুল ইসলাম ও আলতাফ পারভেজের গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে বসবাসরত হরিজন তথা দলিতদের সংখ্যা বর্তমানে ৫৫ থেকে ৬০ লাখ। এদের প্রকৃত সংখ্যা জানার জন্য, ধারাবাহিক উন্নতি আর শিক্ষার সুযোগ তৈরির জন্য আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে। সম্প্রতি রাজধানীর বংশালের আগাসাদেক রোডে হরিজন সম্প্রদায়ের বসতি মিরন জল্লা কলোনি উচ্ছেদ না করার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। কলোনি উচ্ছেদ অভিযানের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে করা রিটের শুনানি শেষে বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি মো. আতাবুল্লাহর বেঞ্চ এ আদেশ দেন। রুলে বিকল্প আবাসনের ব্যবস্থা না করে হরিজনদের উচ্ছেদ কেন অবৈধ হবে না, তাও জানতে চেয়েছেন তারা। কিন্তু এতে আদৌও কী সমস্যার সমাধান হলো? এসব লুকোচুরি খেলা বাদ দিয়ে রাষ্ট্রের উচিত তাদের কল্যাণে এগিয়ে আসা, কারণ এদেশের মুক্তিযুদ্ধে রয়েছে হরিজনদের বিশেষ অবদান। রাষ্ট্রের অগ্রভাগের সৈনিক হিসাবে দেশকে সেবা দিয়েছে সবসময়, তাই তাদের কাছ থেকে থাকার অধিকার কেড়ে নেওয়া ছাড়া কিছুই নয়। ব্রিটিশ আমলে ভারতের তেলেগু থেকে আসা এসব হরিজন সম্প্রদায়ের লোকজন প্রায় চারশ বছর ধরে মিরন জল্লার কলোনিতে বসবাস করছে। এখানে বর্তমানে পাঁচ শতাধিক পরিবার রয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) বলছে, এখানে বসবাস করা পাঁচ শতাধিক পরিবারের মধ্যে ৬৬ জনকে পুনর্বাসন করা হবে। তারা বর্তমানে করপোরেশনের পরিচ্ছন্ন কাজে নিয়োজিত। বাকি পরিবারগুলোকে উচ্ছেদ করে সেখানে বহুতল বাণিজ্যিক ভবন ও কাঁচাবাজার নির্মাণ করা হবে। যদিও এখানে বসবাস করা পরিবারের সদস্যরা কোনো না কোনো সময় সিটি করপোরেশনের কর্মী ছিলেন। তাদের অনেকেই ছাঁটাই হয়েছেন। কারও মৃত্যু হয়েছে। তা ছাড়া এখানে বসবাস করা সবার বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা এই কলোনিতে।

উচ্ছেদ হলে কোথায় যাবেন তারা, এমন চিন্তা থেকে গাছে ঝুলে ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করে একজন, এছাড়াও আতঙ্কে মৃত্যু হয়েছে আরও দুজনের। এতকিছুর পরও কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের পরিবর্তন হয়নি। কলোনির পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের লাইন কেটে দিয়ে সকল বর্বরতাকে হার মানিয়েছে প্রশাসন। মানুষগুলোকে রাস্তায় ঠেলে দিলে, তারা কোথায় যাবে এই নূন্যতম চিন্তাও করল না তারা। একটি গণতান্ত্রিক দেশ এ কেমন আচরণ স্বাধীন জনগণের প্রতি? মানুষকে রাস্তায় ফেলে দিয়ে কীসের উন্নয়ন?

হরিজনরা নানা সমস্যায় জর্জরিত, তার ওপর যুক্ত হলো নতুন সমস্যা উচ্ছেদ অভিযান। আবাসন সংকট, টয়লেট সংকট, বৃষ্টির দিনে ছাদ দিয়ে ঘরে পানি পড়া, ভারী বর্ষণে ড্রেনের ময়লা পানি ঘরে ঢোকাসহ নানা কষ্টে জর্জরিত তাদের জীবন। হরিজনরা একটি খুপরি ঘরে কয়েকটি পরিবার মিলে একসঙ্গে বসবাস করে। জায়গার অভাবে সবাই ঘুমাতে পারে না। পালাক্রমে একেকজনকে ঘুমাতে হয়। অনেক সময় ঘরের ভেতর কক্ষ বানাতে হয় পর্দা দিয়ে। তারা সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা তেমন পায় না। অনেক সময় কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়ে বিনা চিকিৎসায় মারা যায়। তাদের এই কষ্টের জীবনকে কী রাষ্ট্র আলোকিত করতে পারে না?

এখনই দলিত-হরিজনদের জন্য আলাদা একটা দলিত হরিজন কমিশন গঠন করা যার প্রথম কাজ হবে দলিতদের ওপর একটি পূর্ণাঙ্গ শুমারি করা। সমাজে তাদের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। পর্যাপ্ত আবাসন, ভূমি আর চাকরির অধিকার নিশ্চিত করা। তাদের বিকাশের পথ যেভাবে সুগম হয় তা নিশ্চিত করা। সর্বোপরি, তাদের মনে এ আস্থা নিয়ে আসা যে দেশটা তাদেরও।

সারাবাংলা/এসবিডিই

অমিত বণিক গৃহহীন হরিজনদের উচ্ছেদ এবং রাষ্ট্রের দায় মত-দ্বিমত

বিজ্ঞাপন
সর্বশেষ

ইউনিয়ন পরিষদ বাতিলের আহ্বান বিএনপির
২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ২২:৪৫

সম্পর্কিত খবর