Notice: Function _load_textdomain_just_in_time was called incorrectly. Translation loading for the all-in-one-seo-pack domain was triggered too early. This is usually an indicator for some code in the plugin or theme running too early. Translations should be loaded at the init action or later. Please see Debugging in WordPress for more information. (This message was added in version 6.7.0.) in /home/devsarabangla/public_html/wp-includes/functions.php on line 6170

Notice: Function _load_textdomain_just_in_time was called incorrectly. Translation loading for the cps domain was triggered too early. This is usually an indicator for some code in the plugin or theme running too early. Translations should be loaded at the init action or later. Please see Debugging in WordPress for more information. (This message was added in version 6.7.0.) in /home/devsarabangla/public_html/wp-includes/functions.php on line 6170

Notice: Function _load_textdomain_just_in_time was called incorrectly. Translation loading for the sarabangla4 domain was triggered too early. This is usually an indicator for some code in the plugin or theme running too early. Translations should be loaded at the init action or later. Please see Debugging in WordPress for more information. (This message was added in version 6.7.0.) in /home/devsarabangla/public_html/wp-includes/functions.php on line 6170
পাবলো নেরুদার সাহিত্যজুড়ে নিপীড়িত মানুষের কথা
Wednesday 03 Jun 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

পাবলো নেরুদার সাহিত্যজুড়ে নিপীড়িত মানুষের কথা

সৈয়দ আমিরুজ্জামান
২১ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ১৭:০৯

দুনিয়া কাঁপানো কিংবদন্তি বিপ্লবী মহানায়ক কমরেড চে গুয়েভারা ১৭ বছর বয়সে তাঁর প্রথম প্রেমিকাকে নেরুদার কবিতা শুনিয়েছিলেন। তারপর সারাজীবন ধরে এই কবির লেখা সঙ্গে নিয়ে ঘুরেছেন। সিয়েরা মায়েস্ত্রার গেরিলা যুদ্ধের সময় বিকেলবেলায় কমরেড চে তাঁর সৈন্যদেরকে নেরুদার ‘ক্যান্ত জেনেরাল’ থেকে কবিতা পড়ে শোনাতেন। ১৯৬৬ সালে তিনি যখন বলিভিয়ার উদ্দেশে রওয়ানা হন, তখন তাঁর স্ত্রীর জন্য নিজের কণ্ঠস্বরে রেকর্ড করে এসেছিলেন নেরুদার প্রেমের কবিতা। আর ১৯৬৭ সালের অক্টোবর মাসে বলিভিয়ায় আহত কমরেড চে যখন ধরা পড়েন এবং পরদিন সিআইএ যখন তাঁকে হত্যা করে, সেই সময় এই বিপ্লবীর ব্যাকপ্যাকে পাওয়া গিয়েছিল সবুজ রঙের নোটবুক। সেখানে চারজন কবির লেখা উনসত্তরটা কবিতা ছিল, যার বেশির ভাগই নেরুদার লেখা।

বিজ্ঞাপন

সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী কবি ও বিপ্লবী রাজনীতিক কমরেড পাবলো নেরুদা বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও প্রভাবশালী লেখক। পৃথিবী বিখ্যাত কীর্তিমান এই সাহিত্যিকের ৫১তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ।

চিলিয়ান কালজয়ী কবি ও সাহিত্যিক পাবলো নেরুদা ১৯০৪ সালের ১২ জুলাই জন্মগ্রহন করেন। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল নেফতালি রিকার্দো রেয়েস বাসোয়ালতো। পাবলো নেরুদা প্রথমে তাঁর ছদ্মনাম হলেও পরে নামটি আইনি বৈধতা পায়। কৈশোরে তিনি এই ছদ্মনামটি গ্রহণ করেন। ছদ্মনাম গ্রহণের পশ্চাতে দুটি কারণ ছিল। প্রথমত, ছদ্মনাম গ্রহণ ছিল সে যুগের জনপ্রিয় রীতি; দ্বিতীয়ত, এই নামের আড়ালে তিনি তাঁর কবিতাগুলি নিজের পিতার কাছ থেকে লুকিয়ে রাখতেন। তাঁর পিতা ছিলেন কঠোর মনোভাবাপন্ন ব্যক্তি। তিনি চাইতেন তাঁর পুত্র কোনো “ব্যবহারিক” পেশা গ্রহণ করুক। নেরুদা নামটির উৎস চেক লেখক জান নেরুদা এবং পাবলো নামটির সম্ভাব্য উৎস হলেন পল ভারলেইন। পাবলো নেরুদাকে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও প্রভাবশালী লেখক মনে করা হয়। তাঁর রচনা অনূদিত হয়েছে একাধিক ভাষায়।

নেরুদার সাহিত্যকর্মে বিভিন্ন প্রকাশ শৈলী ও ধারার সমাবেশ ঘটেছে। একদিকে তিনি যেমন লিখেছেন টোয়েন্টি পোয়েমস অফ লাভ অ্যান্ড আ সং অফ ডেসপায়ার-এর মতো কামোদ্দীপনামূলক কবিতা সংকলন, তেমনই রচনা করেছেন পরাবাস্তববাদী কবিতা, ঐতিহাসিক মহাকাব্য, এমনকি প্রকাশ্য রাজনৈতিক ইস্তাহারও।

১৯৭১ সালে নেরুদাকে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য তাঁকে এই পুরস্কার প্রদান নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। কলম্বিয়ান ঔপন্যাসিক গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস একদা নেরুদাকে “বিংশ শতাব্দীর সকল ভাষার শ্রেষ্ঠ কবি” বলে বর্ণনা করেন।

বিজ্ঞাপন

১৯৪৫ সালের ১৫ জুলাই, ব্রাজিলের সাও পাওলোর পাকিম্বু স্টেডিয়ামে কমিউনিস্ট বিপ্লবী নেতা লুইস কার্লোস প্রেস্টেসের সম্মানে ১০০,০০০ লোকের সামনে ভাষণ দেন নেরুদা। নোবেল পুরস্কার গ্রহণ করার পর চিলিতে ফিরলে সালভাদর আলেন্দে এস্ত্যাদিও ন্যাশনালে ৭০,০০০ লোকের সামনে ভাষণ দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানান।

জীবদ্দশায় নেরুদা একাধিক কূটনৈতিক পদে বৃত হয়েছিলেন। একসময় তিনি চিলিয়ান কমিউনিস্ট পার্টির সেনেটর হিসেবেও কার্যভার সামলেছেন। কনজারভেটিভ চিলিয়ান রাষ্ট্রপতি গঞ্জালেস ভিদেলা চিলি থেকে কমিউনিজমকে উচ্ছেদ করার পর নেরুদার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করলে তাঁর বন্ধুরা তাঁকে চিলির বন্দর ভালপারাইসোর একটি বাড়ির বেসমেন্টে কয়েক মাসের জন্য লুকিয়ে রাখেন। পরে গ্রেফতারি এড়িয়ে মাইহু হ্রদের পার্বত্য গিরিপথ ধরে তিনি পালিয়ে যান আর্জেন্টিনায়। কয়েক বছর পরে নেরুদা সমাজতন্ত্রী রাষ্ট্রপতি সালভাদর আলেন্দের এক ঘনিষ্ট সহকারীতে পরিণত হন।

চিলিতে অগাস্তো পিনোচেটের নেতৃত্বাধীন সামরিক অভ্যুত্থানের সময়েই ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন নেরুদা। তিন দিন পরেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ১৯৭৩ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর মৃত্যু হয় তাঁর।

জীবন্ত কিংবদন্তি নেরুদার মৃত্যুতে স্বাভাবিকভাবেই সারাবিশ্বে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। পিনোচেট নেরুদার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াকে জনসমক্ষে অনুষ্ঠিত করার অনুমতি দেননি। যদিও হাজারে হাজারে শোকাহত চিলিয়ান সেদিন কার্ফ্যু ভেঙে পথে ভিড় জমান। পাবলো নেরুদার অন্ত্যেষ্টি পরিণত হয় চিলির সামরিক একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রথম গণপ্রতিবাদে।

সমাজতান্ত্রিক চিন্তা চেতনায় সংগ্রামী একজন কবি পাবলো নেরুদা।

তাকে নিয়ে বিদগ্ধজনেরা নানাভাবেই আলোচনা করেছেন। এই বিদগ্ধজনদের আলোচনার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তাদের থেকে ভিন্নভাবে এই মহান কবিকে নিয়ে কিভাবে আলোচনা করা যাবে সেটাই মুল কথা। তিনি সেই সংগ্রামী কবি ‘পরিশ্রমী শব্দ’ চয়নে সংগ্রামী কবিতায় নতুনত্ব দিয়ে কবি মনের অভিপ্রায়কে যেমন ব্যক্ত করেছেন, তেমনী উজ্জীবিত করেছেন সংগ্রামী চেতনাকে।

চিলির একজন রেল শ্রমিকের সন্তান মহান কবি কমরেড পাবলো নেরুদা। পাবলো নেরুদা সমাজতান্ত্রিক মন ও মননে সংগ্রামী চেতনার একজন কবি। যিনি বিশ্বময় নিজেকে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন।

‘পাবলো নেরুদার কবিতার শব্দ চয়নের মধ্যে ক্ষোভ, ক্রোধ রয়েছে।’ তাঁর কবি মনের চিন্তার গভীর প্রবাহমান স্রোত আমাদের উজ্জীবিত করে ।

কবি পাবলো নেরুদা’র কাব্যগ্রন্হ পাঠ করেছি কিশোর বয়েসেই। সাহিত্য দর্পণের একজন কবি তাঁকে নিবেদন করে একটি পোষ্ট দেওয়ায় কবি পাবলো নেরুদার কথা মনে পড়ে গেল। তাকে নিয়ে যখন লিখতে বসেছি, আমার হাতের কাছে শুধু একটি কাব্যগ্রন্হ ‘পাবলো নেরুদার শ্রেষ্ঠ কবিতা’। দুপুরে বাসায় ফিরে গলা চড়িয়ে দিয়েছি কাজের সময় হাতের কাছে পাবলো নেরুদার আর কোন বই পাচ্ছি না। আমার ছেলে শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজের অনার্স (গণিত)-এর ২য় বর্ষের শিক্ষার্থী ও বিএনসিসি (এয়ার উইং) ক্যাডেট সৈয়দ আরমান জামী সাহিত্য চর্চা করে। ওর সংগ্রহে থাকা মহান কবি পাবলো নেরুদার শেষ কাব্যগ্রন্হ ‘ প্রশ্নপুস্তক’ আমার ঘরে দিয়ে গেল আর বললো, তোমার কাজ শেষ হলে আমাকে ফেরৎ দিও।

‘প্রশ্নপুস্তক’ কাব্যগ্রন্হটি অনুবাদ করেছেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনের শিক্ষক রায়হান রাইন। তিনি ভবানীপ্রসাদ দত্তের অনুস্মৃতি থেকে অনূদিত কবি পাবলো নেরুদার বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন।‘ পাবলো নেরুদা বলেছেন, ‘‘আমার স্মৃতি জুড়ে আছে শুধু বৃষ্টি, বৃষ্টি আর বৃষ্টি। মেরু অঞ্চল থেকে, হর্ন অন্তরীপের আকাশ থেকে ফ্রন্টিয়ারে ঝেঁপে আসা প্রপাতের মতো সেই দারুণ দখিনা বৃষ্টি। এই ফ্রন্টিয়ারে, আমার দেশের বন্যা পশ্চিমে প্রথম চোখ মেলে তাকিয়ে চিনেছিলাম মাটি, কবিতা আর বৃষ্টি।’’

১৯৭১ সালের ১০ ডিসেম্বর ওই বছরে অন্য নোবেল-বিজয়ীদের উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণটি তিনি শেষ করেছিলেন এইভাবে, ‘আমরা আমাদের শোণিত ও তমসা দিয়েই তার (সাদা কাগজের) বুক ভরে তুলি; কবিতা তো লিখতে হয় শোণিত ও তমসা দিয়েই।’’

প্রশ্নপুস্তকের কবিতা নিয়ে এই লেখার শেষভাগে আলোকপাত করবো। আমি শুরু করছি তাঁর শ্রেষ্ঠ কবিতা গ্রন্হে গ্রন্হিত কয়েকটি কবিতা দিয়ে। অসীত সরকার তাঁর এই কবিতা বাংলা ভাষায় অনুবাদ করেছেন। এই অনুবাদ সাহিত্য আছে বলেই আমরা অন্য ভাষায় রচিত কবিতা পাঠ করতে পারছি। এ নিয়ে আলোচনা করতে সক্ষম হচ্ছি।

অনুবাদ খুব সহজ কাজ নয়। আবার কোনো কোনো সময় ভিন্ন ভাষায় রচিত কোনো লেখকের লেখার মনের ভাবের সাথে পুরোপুরি তার সেই মন-ভাবের সংযোগে কিছু দূরত্ব থাকতে পারে। তারপরও যারা পরিশ্রম করে ভিন্ন ভাষার সাহিত্যের অনুবাদ করেন, তারা চেষ্টা করেন মূল লেখকের মন-চিন্তা, দর্শনের কাছাকাছি যাওয়ার। কবি পাবলো নেরুদার ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ গ্রন্হ-এর ভূমিকায় ওয়ান্ট হুইটম্যানের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে; ‘ তিনি মহান কবি, যিনি প্রতিটি শব্দে রক্ত ঝরাতে পারেন।’ পাবলো নেরুদা ঠিক সেই ধরণেরই সৈনিক –কবি, যিনি আজীবন মুখ চেয়ে মুমূর্ষু সমাজের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে গেছেন।

নেরুদার সারা জীবনের সাহিত্যকৃতি জুড়ে রয়েছে সেই সব অগনন নির্যাতিত নিপীড়িত মানুষ। যাঁরা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রামে আত্মোৎসর্গ করেছেন, কিংবা শান্তির জন্যে বুকে বুক দিয়ে আজও লড়ছেন।

কবি পাবলো নেরুদা শুধু সমাজতান্ত্রিক চিন্তা এবং সময়ের উপর ভর করে বিপ্লবী কবিতা লিখেছেন তা নয়। তিনি অনেক প্রেমের কবিতাও রচনা করেছেন।একজন বিশুদ্ধ রাজনীতিক মানুষ শুধু সংগ্রাম-আন্দোলনকে বেশী প্রাধান্য দেন। একজন কবি ও রাজনীতিক সেটি করেন না। কারণ কবি মনের মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি প্রেমে সাড়া দেয়। কবি পাবলো নেরুদা প্রেমের অনেক সুন্দর কবিতা লিখেছেন। অনেক কবিতার মধ্যে প্রেম এবং জীবনের চাহিদার কথা উচ্চারিত হয়েছে খুব সাবলিলভাবে। এখানে তিনি একজন সার্থক-সফল প্রেমের কবি।

কবি পাবলো নেরুদা কবিতার পাশাপাশি স্মৃতি কথা লিখেছেন। তাঁর উপলব্দির গভীরতা দিয়ে রচিত স্মৃতি কথাই তাঁর রাজনৈতিক দর্শন উঠে এসেছে। তাঁর স্মৃতি কথায় অনেকের কথা উল্লেখিত হয়েছে। যাঁরা সবাই সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে সমাজ বিনির্মাণের নেতা। আমাদের নিবন্ধের মুল বিষয় তাঁর স্মৃতি কথা নিয়ে নয়। কবি পাবলো নেরুদার কবিতা নিয়ে। তবুও তাঁর স্মৃতি কথার কথামালার কিয়দংশ উল্লেখ করা প্রয়োজন বলে মনে করছি ।

চিলির এই সন্তান মহান কবি পাবলো নেরুদার স্মৃতি কথা এক বিস্তৃত আঙ্গিনা। এখানে আছেন‘ লরকা, আরাগ, পিকাসো, রিভেরা, মহাত্মা গান্ধী, নেহেরু, মাও সেতুং, ক্যাস্ট্রো, চে গুয়েভারা, আলেন্দর এবং বহু প্রতিভাবান সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক নেতারা। এ থেকে সুধী-প্রজ্ঞাবান পাঠক বুঝতে পারছেন, কবি পাবলো নেরুদাকে। এরপর আমি আর কথা বাড়াবো না। ফিরে যাবো কবি পাবলো নেরুদার কবিতার আঙ্গিনায়- কবি পাবলো নেরুদা লিখলেন, ‘‘ নারীর রমণীয় শরীর, সাদা পাহাড়, শুভ্র উরু,/আত্মদানের ভঙ্গিতে তুমি শুয়ে আছো, এ উর্বরা পৃথিবী।
আমার এ চাষাড়ে দেহ তোমাকে গভীর ভাবে কর্ষণ করছে/যাতে মাটির গহন থেকে লাফিয়ে উঠতে পারে শিশু/..

অন্ধকার নদীগর্ভে চিরদিনই বহমান শাশ্বত অনন্ত তৃষ্ণা,/তারই পেছনে ত্রস্ত ধেয়ে আসে যত ক্লান্তি আর অন্তহীন ব্যথা।’’(নারীর শরীর, পাবলো নেরুদার শ্রেষ্ঠ কবিতা গ্রন্হ) কবি পাবলো নেরুদার প্রেমাশ্রয়ী এই কবিতায় জৈবিক চাহিদার কথা উচ্চারিত হয়েছে ভিণ্ন মাত্রায়। তার এই নারী হলো পৃথিবীর উর্বর মাটি। যাকে চাষ করলে উঠে আসে শিশু। এই শিশু বলতে তিনি ফসলের চারাকে বুঝিয়েছেন। এখানেই কবি পাবলো নেরুদা।

পাবলো নেরুদা কবি হিসেবে অনেক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন। সাহিত্যের সাথে নিত্যদিন যোগাযোগ আছে। লরকার নাম শোনেনি এই রকম সাহিত্যিকদের সংখ্যা মনে করি নেহাতেই কম। বিখ্যাত স্প্যানিশ কবি লরকার পুরো নাম ফেদেরিকো গার্থিয়া লরকা। কবি লরকাকে ফ্যাসিস্টরা ১৯৩৬ সালের আগষ্ট মাসে গ্রানাদায় গুলি করে হত্যা করে।

এই সময়কালে অনেক কবি-সাহিত্যিককে হত্যা করা হয়। এই সময়কালটি এমন যে, ফ্যাসিবাদ বিরোধী নাম করা কবিদের একেবারে নির্মূল করে পুথিবীকে মেধাশূণ্য করার পরিকল্পনা করা হয়। জীবদ্দশায় লড়াকু কবি লরকা পাবলো নেরুদা সম্পর্কে বলেছিলেন,‘ রুবেন দারিওর মৃত্যুর পর পাবলো নেরুদা হলেন আমেরিকার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কবি।

বিশ্ব নন্দিত শিল্পী পাবলো পিকাসো এবং প্রখ্যাত চেক সাহিত্যিক জাঁ নেরুদা এই দুই জনের কাছ থেকেই তিনি নিজের নাম গ্রহণ করেন, ‘পাবলো নেরুদা’।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করেন ১৯২৬ সালে। চিলির সরকারি কর্তৃপক্ষ মাত্র তেইশ বছর বয়সী প্রতিভাবান পাবলো নেরুদাকে রেঙ্গুনে রাষ্ট্রদূত করে প্রেরণ করে।এই পদে অধিষ্ঠিত থাকার ফলে তিনি বহু দেশ ভ্রমণ করেন। এর মধ্যে ভারত বর্ষ, জাপান, চীন, জাভা, কলম্বো, সিঙ্গাপুর প্রভৃতি।

কবি পাবলো নেরুদার সময়কাল গৃহযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অতিক্রান্ত হয়েছে। ভয়ংকর-ভয়াবহ সময়। এই সময় মন জগতকে শান্ত রেখে সংগ্রামীদের সাহস দিতে কবিতা লেখা খুব সহজ কাজ নয়। যুক্তি দিয়ে নিজেকে বোঝা, পরিবেশকে উপলব্ধি করা আর জীবনের প্রতি মুহুর্তে মৃত্যুর হাতছানি এই পরিবেশের মধ্যে কবিতা রচনা করা তাও আবার ফ্যাসিস্টদের বিরুদ্ধে এটি খুব সহজ কাজ নয়। অত্যন্ত মেধাবী কবি পাবলো নেরুদা কবিতার মধ্যেও নিপীড়িত মানুষ, বুলেটে ক্ষত-বিক্ষত লাশ, হাড়-গোড় নিয়ে পড়ে থাকা মানুষের জন্য লড়েছেন কলম হাতে একজন কবি এবং রাজনৈতিক নেতা হিসেবে।

বার্লিন পুড়ছে। খনি শ্রমিকদের গুলি করে হত্যা করা হচ্ছে। ১৯৩৬ সালে জুলাই মাসে স্পেনে আক্রমন করা হলো। গৃহযুদ্ধের এই আগুনের প্রচন্ডতাপ পাবলো নেরুদাকেও স্পর্শ করলো। কবি পাবলো নেরুদা মুক্তিযোদ্ধাদের দলে যোগ দিলেন। ‘ফ্রাংকো আর ফ্যাসিস্ট সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে স্পেনের জনগণের বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামের সেই অগ্নিময় দিনগুলোতে নেরুদা রচনা করলেন, তাঁর শ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্হ ‘ প্রাণের স্পেন’ (১৯৩৮)।’

‘পাবলো নেরুদা ১৯৪০-১৯৪৩ সাল পর্য়ন্ত মেক্সিকোতে চিলির রাষ্ট্রদূত হিসেবে কাজ করেন। ১৯৪৫ সালে চিলির কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিয়ে সিনেটর নির্বাচিত হন।’ খনি শ্রমিকদের সংগঠন গড়ে তোলেন । নেরুদার বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হলো, তাঁর বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতার অভিযোগ আনা হলো। পাবলো নেরুদা দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হলেন। তারপরও থেমে থাকেনি তাঁর কলম। তিনি পলাতক সময়ে তাঁর স্মৃতি কথায় লিখলেন, ‘পলাতক নামে দীর্ঘ কবিতা।

পাবলো নেরুদাকে বহু গুণগত বিশেষণে বিশেষায়িত করলেও, মনে হয় তাকে অনেক বিশেষণে ভূষিত করা হলো না। তিনি প্রেমের কবি মানবতার কবি, বিপ্লবের কবি ,সমাজতান্তিক চেতনার কবি। সুন্দর পৃথিবীর জন্য এক লড়াকু সৈনিক রাজনৈতিক নেতা এবং কবি। সবগুণেই তাকে গুণান্বিত করা যায়। (আমরা পাবলো নেরুদাকে নিয়ে একটি নিবন্ধ রচনা করছি; এর কলেবর খুব বেশী বাড়ানো ঠিক হবে না)।

দক্ষিণ চিলির এক প্রত্যন্ত গ্রামের নাম ‘পাররাঙ্গল’। এখানেই তাঁর জন্ম। জন্মের মাত্র এক মাস পর তার মা দোনা রোসা বাসোআলতো মারা যান। মাতৃহারা এই শিশু সন্তানকে নিয়ে পিতা রেলের ইঞ্জিন চালক দোন হোসে দেল কার্মেন রেইয়েসে মোরালেসা আর এক জীর্ণ গ্রাম তেমুকোতে চলে আসেন। এই গ্রামে থাকাকালে দরিদ্র পরিবারের সন্তান পাবলো নেরুদা শৈশবকালে তাঁর জীবনের অভিজ্ঞতা কবিতায় বর্ণনা করলেন : ‘আমি বাস করছি তেমুকো, আর আমার থাকার ঘরের বাতায়ন পথে / দুচোখ মেলে দেখি আমি কাদা আর কাদা…
আর এই কর্দামাক্ত পথে .. চলে যেতো কাঠের আচ্ছাদনে আবৃত ঠেলাগাড়িগুলো/কী তাদের আর্তনাদ! এক ভয়াবহ যন্ত্রণা যেন তাদের। ……।’

শৈশব মনেই জেগে ওঠে মানুষের কষ্টের আওয়াজ এই কবিতায়। কাদা পথে ঠেলাগাড়িওয়ালারা কত কষ্ট করে ঠেলে নিয়ে যায় গাড়ি। কবি পাবলো নেরুদার শৈশব মনে এই ছবি ধরা পড়ে।

সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী কবি পাবলো নেরুদা এক অসাধারণ, প্রজ্ঞাবান কবি, রাজনৈতিক নেতা এবং কূটনীতিক ছিলেন। তাঁর কবিতায় (যে গুলো বাংলা ভাষায় অনূদিত হয়েছে) খুব সাবলিলভাবে উঠে এসেছে সমাজজীবন-চিত্র, প্রেম-ভালোবাসা, নিপীড়িত মানুষের কথা। কবি পাবলো নেরুদার ছদ্মনামই পড়ে আইনগত নামে পরিনত হয়।

নোবেল বিজয়ী কবি পাবলো নেরুদা শেষ কাব্যগ্রন্হ প্রশ্নপুস্তকের কয়েকটি কবিতা নিয়ে আলোচনা করবো আমরা শুরুতেই বলেছিলাম। তাঁর প্রশ্নপুস্তক এবং অন্যান্য কাব্যগ্রন্হ, স্মৃতিচারণ লেখা নিয়ে অনেক প্রজ্ঞাবান কবি-সাহিত্যিক অনুবাদ করেছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, কবি শামসুর রাহমান, মাসুদুজ্জামান, বিকাশ গন চৌধুরী প্রমুখ।

আমি প্রশ্নপুস্তক কাব্যগ্রন্হটির উপর আলোকপাত করছি। এই কাব্যগ্রন্হের অনুবাদক জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনের শিক্ষক ও সাহিত্যিক রায়হান রাইন কাব্যগ্রন্হের ভূমিকায় বলেছেন, ‘প্রশ্নপুস্তক, আগাগোড়া প্রশ্ন দিয়ে গড়া। একটা গোটা কাব্যগ্রন্হ কেবলই প্রশ্নের সিরিজ! কেবল প্রশ্নবাক্যে সাজিয়ে কিভাবে রচিত হতে পারে একটা কাব্যগ্রন্হ? লক্ষ্য করলে আমরা দেখব. প্রশ্নবোধক বাক্যের শরীরে এমন একটা পরিসর আছে যাতে এঁটে যেতে পারে বার্তাবহ বর্ণনা, অনুজ্ঞা এবং বিস্ময়ও।’

আগেই বলে রাখা ভালো কবি পাবলো নেরুদার ‘প্রশ্নপুস্তক’ কাব্যগ্রন্হটি তাঁর পড়ন্ত বয়সে লেখা।
‘ আমায় বলো, গোলাপ কি নগ্ন ?
নাকি ওইটাই তার একমাত্র পোষাক?
….
এমন কিছু কি আছে দুনিয়ায়
দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে থা্কা ট্রেনের চেয়ে যা বিষন্নতর?
এই কবিতায় কবি প্রশ্ন করেছেন, আমায় বলো, গোলাপ কি নগ্ন?
নাকি ওইটাই তার একমাত্র পোষাক?
কি অসাধারণ প্রশ্ন। সৌন্দর্য়ে বিকশিত সবার কাছে প্রিয় ফুল গোলাপ। এই গোলাপ প্রষ্ফুটিত হওয়ার পর নগ্নই তো। এই নগ্নতা অপবিত্র এ কথা বলা যায় কি? কেউ এ কথা কখনও বলেছেন বলে আমাদের জানা নেই। গোলাপের সৌরভ আর সৌন্দর্য় আমাদের মোহিত করে, মুগ্ধ করে। তার নগ্নতা নয়। কবি পাবলো নেরুদা এই প্রশ্নকে সামনে এনে নিজেই প্রশ্নের মাধ্যমে জানতে চেয়েছেন; ‘নাকি ওইটাই তার একমাত্র পোষাক? এই প্রশ্নের উত্তরে বলা যায়, প্রষ্ফুটিত গোলাপ নগ্ন নয়; এটি তার সৌন্দর্য়।

কবি পাবলো নেরুদা প্রশ্নপুস্তক কাব্যগ্রন্হে অনেক কবিতা লিখেছেন, তাঁর আরো একটি কবিতা উদ্ধৃত করছি ‘ অরণ্যের হলুদ রঙ কি গত বছরেরটাই?
আর অদম্য সমুদ্র-পাখিগুলোর একই কালো ঝাঁক
কি ওড়ে বার বার?
আর যেখানে স্থানের শেষ
সেটাই কি মৃত্যু নাকি অনন্ত?
বেষ্টনীর উপর কিসের ভার বেশী
বিষন্নতা নাকি স্মৃতি-সম্ভাররে?
(প্রশ্নপুস্তক ,পাবলো নেরুদা, পৃ: ৬৩)
প্রশ্ন বাক্যে রচনা করা এই কাব্যগ্রন্হের এই কবিতাটি কবি মনের এক গভীর দার্শনিক চিন্তা সামনে নিয়ে আসে। এই কবিতায় কবি পাবলো নেরুদার প্রশ্ন ‘আর যেখানে স্থানের শেষ
সেটাই কি মৃত্যু নাকি অনন্ত?
প্রশ্নের মধ্যে সেই চিন্তার প্রকাশ ঘটিয়েছেন, মৃত্যু আর অনন্তকে সামনে এনে। কবির প্রশ্ন চিন্তায় মৃত্যুই কি শেষ নাকি এরপর আরো কোন জগত আছে, সেই জগত অনন্তকালের। এই চিন্তাকেই তিনি প্রশ্ন বাক্যে কবিতায় নিয়ে এসেছেন। এখানেই কবি পাবলো নেরুদা। এই মহান কবি শুচি-শুভ্র-পবিত্র শব্দ দিয়ে লিখেছেন, কবিতা, স্মৃতিকথা, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে বক্তৃতা। যার সবই এক সৃষ্টির সম্ভার। মহান কবি পাবলো নেরুদা ১৯৭৩ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর সব মায়া ত্যাগ করে চলে যান। তাঁর এই যাত্রা কি? তাঁর প্রশ্নের মত অনন্ত কোন জগতে?

সুপ্রিয় পাঠক, কবি পাবলো নেরুদার মৃত্যুবার্ষিকীকে উপলক্ষ করে এই লেখাটি নয়। মহান, কৃতিমান মানুষদের নিয়ে সব সময়ই লেখা যায় আমরা এটা বিশ্বাস করি। পরিশেষে, সমাজতন্ত্র অভিমুখী অসাম্প্রদায়িক জনগণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রত্যয়ে সমতা-ন্যায্যতার প্রশ্নে বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনেই বিশ্বজনীন মহান এই গুণীর সাহিত্য, রাজনীতি, জীবন সংগ্রাম, কীর্তি, ইতিহাস, তত্ত্ব ও অনুশীলন সম্পর্কে পাঠ প্রাসঙ্গিক ও জরুরী। সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী কবি কমরেড পাবলো নেরুদার প্রতি আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা ও অভিবাদন!

লেখক: মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট

সারাবাংলা/এজেডএস

পাবলো নেরুদা সৈয়দ আমিরুজ্জামান

বিজ্ঞাপন
সর্বশেষ

ইউনিয়ন পরিষদ বাতিলের আহ্বান বিএনপির
২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ২২:৪৫

সম্পর্কিত খবর