Notice: Function _load_textdomain_just_in_time was called incorrectly. Translation loading for the all-in-one-seo-pack domain was triggered too early. This is usually an indicator for some code in the plugin or theme running too early. Translations should be loaded at the init action or later. Please see Debugging in WordPress for more information. (This message was added in version 6.7.0.) in /home/devsarabangla/public_html/wp-includes/functions.php on line 6170

Notice: Function _load_textdomain_just_in_time was called incorrectly. Translation loading for the cps domain was triggered too early. This is usually an indicator for some code in the plugin or theme running too early. Translations should be loaded at the init action or later. Please see Debugging in WordPress for more information. (This message was added in version 6.7.0.) in /home/devsarabangla/public_html/wp-includes/functions.php on line 6170

Notice: Function _load_textdomain_just_in_time was called incorrectly. Translation loading for the sarabangla4 domain was triggered too early. This is usually an indicator for some code in the plugin or theme running too early. Translations should be loaded at the init action or later. Please see Debugging in WordPress for more information. (This message was added in version 6.7.0.) in /home/devsarabangla/public_html/wp-includes/functions.php on line 6170
রবীন্দ্রনাথের ‘নাইট’ খেতাব বর্জনের ১০৫ বছর
Wednesday 03 Jun 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

রবীন্দ্রনাথের ‘নাইট’ খেতাব বর্জনের ১০৫ বছর

সৈয়দ আমিরুজ্জামান
২৯ এপ্রিল ২০২৪ ১৬:৪৫

বল বীর-
বল উন্নত মম শির!
শির নেহারি আমারি,
নত-শির ওই শিখর হিমাদ্রীর!

বল বীর –
বল মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি’
চন্দ্র সূর্য্য গ্রহ তারা ছাড়ি’
ভূলোক দ্যুলোক গোলক ভেদিয়া,
খোদার আসন ‘আরশ’ ছেদিয়া
উঠিয়াছি চির-বিস্ময় আমি বিশ্ব-বিধাত্রীর!
মম ললাটে রুদ্র-ভগবান জ্বলে রাজ-রাজটীকা দীপ্ত জয়শ্রীর!

বল বীর –
আমি চির-উন্নত শির!
আমি চিরদুর্দ্দম, দুর্বিনীত, নৃশংস,
মহা-প্রলয়ের আমি নটরাজ, আমি সাইক্লোন, আমি ধ্বংস,
আমি মহাভয়, আমি অভিশাপ পৃথ্বীর!

আমি দুর্ব্বার,
আমি ভেঙে করি সব চুরমার!
আমি অনিয়ম উচ্ছৃঙ্খল,
আমি দ’লে যাই যত বন্ধন, যত নিয়ম কানুন শৃংখল!
আমি মানি নাকো কোনো আইন,
আমি ভরা-তরী করি ভরা-ডুবি, আমি টর্পেডো, আমি ভীম,

ভাসমান মাইন!
আমি ধূর্জ্জটী, আমি এলোকেশে ঝড় অকাল-বৈশাখীর!
আমি বিদ্রোহী আমি বিদ্রোহী-সূত বিশ্ব-বিধাত্রীর!

বল বীর –
চির উন্নত মম শির!
আমি ঝঞ্ঝা, আমি ঘূর্ণী,
আমি পথ-সম্মুখে যাহা পাই যাই চূর্ণী!
আমি নৃত্য-পাগল ছন্দ,
আমি আপনার তালে নেচে যাই, আমি মুক্ত জীবনানন্দ।
আমি হাম্বীর, আমি ছায়ানট, আমি হিন্দোল,
আমি চল-চঞ্চল, ঠুমকি’ ছমকি’
পথে যেতে যেতে চকিতে চমকি’
ফিং দিয়া দিই তিন দোল্!
আমি চপলা-চপল হিন্দোল!

আমি তাই করি ভাই যখন চাহে এ মন যা’,
করি শত্রুর সাথে গলাগলি, ধরি মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা,
আমি উন্মাদ, আমি ঝঞ্ঝা!
আমি মহামারী, আমি ভীতি এ ধরিত্রীর।
আমি শাসন-ত্রাসন, সংহার আমি উষ্ণ চির-অধীর।

বল বীর –
আমি চির-উন্নত শির!
আমি চির-দুরন্ত-দুর্ম্মদ,
আমি দুর্দ্দম, মম প্রাণের পেয়ালা হর্দ্দম্ হ্যায়্ হর্দ্দম ভরপুর মদ।
আমি হোম-শিখা, আমি সাগ্নিক, জমদগ্নি,
আমি যজ্ঞ, আমি পুরোহিত, আমি অগ্নি!
আমি সৃষ্টি, আমি ধ্বংস, আমি লোকালয়, আমি শ্মশান,
আমি অবসান, নিশাবসান।
আমি ইন্দ্রাণি-সূত হাতে চাঁদ ভালে সূর্য্য,
মম এক হাতে-বাঁকা বাঁশের বাঁশরী, আর হাতে রণ-তূর্য্য।
আমি কৃষ্ণ-কন্ঠ, মন্থন-বিষ পিয়া ব্যথা বারিধির।
আমি ব্যোমকেশ, ধরি বন্ধন-হারা ধারা গঙ্গোত্রীর।

বিজ্ঞাপন

বল বীর –
চির উন্নত মম শির।
আমি সন্ন্যাসী, সুর-সৈনিক
আমি যুবরাজ, মম রাজবেশ ম্লান গৈরিক!
আমি বেদুঈন, আমি চেঙ্গিস,
আমি আপনা ছাড়া করি না কাহারে কুর্ণিশ!
আমি বজ্র, আমি ঈশান-বিষাণে ওঙ্কার,
আমি ইস্ত্রাফিলের শিঙ্গার মহা-হুঙ্কার,
আমি পিনাক-পাণির ডমরু-ত্রিশূল, ধর্ম্মরাজের দন্ড,
আমি চক্র ও মহাশঙ্খ, আমি প্রণব-নাদ-প্রচন্ড!
আমি ক্ষ্যাপা দুর্বাসা-বিশ্বামিত্র-শিষ্য,
আমি দাবানল-দাহ, দাহন করিব বিশ্ব!
আমি প্রাণ-খোলা-হাসি উল্লাস, – আমি সৃষ্টি-বৈরী মহাত্রাস,
আমি মহা-প্রলয়ের দ্বাদশ রবির রাহু-গ্রাস!
আমি কভু প্রশান্ত, – কভু অশান্ত দারুণ স্বেচ্ছাচারী,
আমি অরুণ খুনের তরুণ, আমি বিধির দর্প-হারী!
আমি প্রভঞ্জনের উচ্ছাস, আমি বারিধির মহাকল্লোল,
আমি উজ্জ্বল আমি প্রোজ্জ্বল,
আমি উচ্ছল জল-ছল-ছল, চল-ঊর্মির হিন্দোল্ দোল!

আমি বন্ধন-হারা কুমারীর বেণী, তন্বী-নয়নে বহ্নি,
আমি ষোড়শীর হৃদি-সরসিজ প্রেম-উদ্দাম, আমি ধন্যি।
আমি উন্মন মন উদাসীর,
আমি বিধবার বুকে ক্রন্দন-শ্বাস, হা-হুতাশ আমি হুতাশীর!
আমি বঞ্চিত ব্যথা পথবাসী চির-গৃহহারা যত পথিকের,
আমি অবমানিতের মরম-বেদনা, বিষ-জ্বালা, প্রিয়-লাঞ্ছিত বুকে গতি ফের!
আমি অভিমানী চির-ক্ষুব্ধ হিয়ার কাতরতা, ব্যথা সুনিবিড়,
চিত-চুম্বন-চোর-কম্পন আমি থর-থর-থর প্রথম পরশ কুমারীর!

আমি গোপন প্রিয়ার চকিত চাহনি, ছল ক’রে দেখা অনুখন,
আমি চপল মেয়ের ভালোবাসা, তা’র কাঁকন-চুড়ির কন্-কন্।
আমি চির-শিশু, চির-কিশোর,
আমি যৌবন-ভীতু পল্লীবালার আঁচর কাঁচলি নিচোর!
আমি উত্তর-বায়ু, মলয়-অনিল, উদাসী পূরবী হাওয়া,
আমি পথিক-কবির গভীর রাগিণী, বেণু-বীনে গান গাওয়া!
আমি আকুল নিদাঘ-তিয়াসা, আমি রৌদ্র রবি,
আমি মরু-নির্ঝর ঝর-ঝর, আমি শ্যামলিমা ছায়া-ছবি! –
আমি তুরিয়ানন্দে ছুটে চলি এ কি উন্মাদ, আমি উন্মাদ!
আমি সহসা আমারে চিনেছি, আমার খুলিয়া গিয়াছে সব বাঁধ!
আমি উত্থান, আমি পতন, আমি অচেতন-চিতে চেতন,
আমি বিশ্ব-তোরণে বৈজয়ন্তী, মানব বিজয় কেতন!

বিজ্ঞাপন

ছুটি ঝড়ের মতন করতালি দিয়া স্বর্গ-মর্ত্ত্য করতলে,
তাজি বোরবাক্ আর উচ্চৈস্রবা বাহন আমার হিম্মত-হ্রেস্বা হেঁকে চলে!

আমি বসুধা-বক্ষে আগ্নেয়াদ্রি, বাড়ব-বহ্নি, কালানল,
আমি পাতালে মাতাল অগ্নি-পাথর-কলরোল-কল-কোলাহল!
আমি তড়িতে চড়িয়া উড়ে চলি জোর তুড়ি দিয়া, দিয়া লম্ফ,
আমি ত্রাস সঞ্চারি ভুবনে সহসা, সঞ্চরি’ ভূমি-কম্প!
ধরি বাসুকির ফনা জাপটি’, –
ধরি স্বর্গীয় দূত জিব্রাইলের আগুনের পাখা সাপটি’!
আমি দেব-শিশু, আমি চঞ্চল,
আমি ধৃষ্ট আমি দাঁত দিয়া ছিঁড়ি বিশ্ব-মায়ের অঞ্চল!

আমি অর্ফিয়াসের বাঁশরী,
মহা-সিন্ধু উতলা ঘুম্-ঘুম্ ঘুম্ চুমু দিয়ে করি নিখিল বিশ্বে নিঝ্ঝুম্
মম বাঁশরী তানে পাশরি’
আমি শ্যামের হাতের বাঁশরী।
আমি রুষে উঠে’ যবে ছুটি মহাকাশ ছাপিয়া,
ভয়ে সপ্ত নরক হারিয়া দোজখ নিভে নিভে যায় কাঁপিয়া!
আমি বিদ্রোহ-বাহী নিখিল অখিল ব্যাপিয়া!

আমি শ্রাবণ প্লাবন- বন্যা, কভু ধরণীরে করি বরণিয়া, কভু বিপুল ধ্বংস-ধন্যা –
আমি ছিনিয়া আনিব বিষ্ণু-বক্ষ হইতে যুগল কন্যা!
আমি অন্যায়, আমি উল্কা, আমি শনি,
আমি ধূমকেতু-জ্বালা, বিষধর কাল-ফণি!
আমি ছিন্নমস্তা চন্ডী, আমি রণদা সর্বনাশী,
আমি জাহান্নামের আগুনে বসিয়া হাসি পুষ্পের হাসি!

আমি মৃণ্ময়, আমি চিন্ময়,
আমি অজর অমর অক্ষয়, আমি অব্যয়!
আমি মানব দানব দেবতার ভয়,
বিশ্বের আমি চির দুর্জ্জয়, জগদীশ্বর-ঈশ্বর আমি পুরুষোত্তম সত্য,
আমি তাথিয়া তাথিয়া মথিয়া ফিরি এ স্বর্গ-পাতাল-মর্ত্ত্য
আমি উন্মাদ, আমি উন্মাদ!!
আমি চিনেছি আমারে, আজিকে আমার খুলিয়া গিয়াছে সব বাঁধ!!
আমি পরশুরামের কঠোর কুঠার,
নিঃক্ষত্রিয় করিব বিশ্ব, আনিব শান্তি শান্ত উদার!
আমি হল বলরাম স্কন্ধে,
আমি উপাড়ি’ ফেলিব অধীন বিশ্ব অবহেলে নব সৃষ্টির মহানন্দে।

মহা-বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত,
যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল, আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না,
অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না-বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত!
আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান বুকে এঁকে দিই পদ-চিহ্ন,
আমি স্রষ্টা-সূদন, শোক-তাপ-হানা খেয়ালী বিধির বক্ষ করিব-ভিন্ন!
আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান বুকে এঁকে দেবো পদ-চিহ্ন!
আমি খেয়ালী বিধির বক্ষ করিব ভিন্ন!
আমি চির-বিদ্রোহী বীর –
আমি বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা চির-উন্নত শির!
-(‘বিদ্রোহী’ – কাজী নজরুল ইসলাম)

অবিভক্ত ভারতবর্ষে ১৯১৯ সালের জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের বৃটিশ প্রদত্ত ‘নাইট’ খেতাব বর্জনের পর এবার ১০৫ বছর পূর্ণ হয়েছে। বিনা-পরোয়ানায় গ্রেপ্তার ও বিচার ছাড়া দীর্ঘকাল কারাবাসসহ অন্যান্য বিধান সম্বলিত কুখ্যাত কালো আইন ‘ রাওলাট অ্যাক্ট চালুর প্রতিবাদে জালিয়ানওয়ালাবাগের বিশাল সমাবেশে বর্বরোচিত হামলা ও হত্যাকান্ড পৃথিবীর ইতিহাসে কুখ্যাত এক গণহত্যা। এর প্রতিবাদে কবিগুরুর এই বিরল সম্মান বর্জনের দৃষ্টান্ত আমাদের মহিমান্বিত করেছে।

কবিগুরু এমন এক মানুষ যার হাত ধরে তৈরি হয়েছে নতুন এক অধ্যায়ের। তিনি বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং শিল্পকলাতে নবজাগরণ ঘটিয়ে বিশ্বের দরবারে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি সারাজীবন হৃদয়ের গহীনে লালন করেছেন মানবমুক্তির দর্শন। তার সৃষ্টি করা কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস সমূহ মানুষকে আজও আকর্ষিত করে। এককথায় বলা যায় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ আমাদের মনে ও চিন্তাভাবনায় বিরাজ করেন সর্বদা।

কবি, নাট্যকার, কথাশিল্পী, গীতিকার, সুরকার, সঙ্গীত পরিচালক এবং ভাষাবিদের পাশাপাশি জীবনের শেষ পর্যায়ে তিনি চিত্রকর হিসেবেও খ্যাতি অর্জন করেন। তার জন্মদিন নিয়ে তিনি লিখেছিলেন ‘ওই মহামানব আসে/ দিকে দিকে রোমাঞ্চ/মর্ত্য ধুলির ঘাসে ঘাসে‘। সাহিত্যে ১৯১৩ সালে ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থের মাধ্যমে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন তিনি। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা করতে তিনি চালু করেন ‘রাখিবন্ধন’ উৎসব।

রবীন্দ্রনাথ তার সাহিত্যের মাধ্যমেই লড়াই করে গেছেন ইংরেজদের বিরুদ্ধে। দেশকে স্বাধীন করতে সাধারণ মানুষের মনে দেশপ্রেমের জোয়ার আনার জন্য লিখেছেন অসংখ্য দেশাত্মবোধক গান, পাশাপাশি ত্যাগ করেন ইংরেজদের দেওয়া ‘নাইট’ উপাধি। কেন নাইট উপাধি ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বিশ্বকবি?

১৯১৩ সালে নোবেল গ্রহণ করার পর, ১৯১৫ সালের ৩ জুন সাহিত্য প্রতিভার স্বীকৃতি স্বরূপ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ইংরেজরা ‘নাইটহুড‘ সম্মানে ভূষিত করেন। কিন্তু ১৯১৯ সালের ২৯ এপ্রিল তিনি ত্যাগ করেন সেই উপাধি। কারণ, জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকান্ড মেনে নিতে পারেননি কবিগুরু। ঘটনা ঘটার পর তিনি জানতে পারেন। নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় প্রতিবাদ জানানোর জন্য এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন তিনি।

জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকান্ড ভারতের ইতিহাসে কুখ্যাত এক গণহত্যা। ১৯১৯ সালের ১০ মার্চ রাওলাট অ্যাক্ট চালু হয়। বিচারপতি স্যর সিডনি রাওলাট-এর মস্তিষ্কপ্রসূত এই আইনে হাড় হিম করা ক্ষমতা দেওয়া হল পুলিশকে। আইনে বলা হল, বিনা-পরোয়ানায় গ্রেপ্তার, বিচার ছাড়া দীর্ঘকাল কারাবাস। অভিযুক্তরা জানতেই পারতনা কেন তাদের গ্রেপ্তার করা হলো। এমনকি মুক্তি পাওয়ার পরেও মুচলেকা দিয়ে লিখে নেওয়া হতো তারা যেন কোনও রাজনৈতিক, ধর্মীয় এবং শিক্ষাগত কর্মকাণ্ডে যুক্ত না থাকে। পাঞ্জাবে এই আইনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিয়েছিল ভারতীয়রা। এর কারণে অকথ্য অত্যাচার চলেছে ভারতীয়দের উপরে। তাও মাথা নত করেনি পাঞ্জাবি প্রতিবাদীরা। তারা ঠিক করলেন জালিয়ানওয়ালাবাগের মাঠে ১৩ এপ্রিল প্রতিবাদ সভা হবে। সেইমতো সেখানে জড়ো হন কয়েক হাজার মানুষ। জেনারেল ডায়ার বুঝতে পেরে প্রায় ১০০ জন বালুচি আর গুর্খা সৈন্য নিয়ে আক্রমণ চালান সভাস্থলে। ছত্রভঙ্গ করতে নির্বিচারে গুলি চালায় ইংরেজ সৈন্যরা। প্রাণ যায় শত শত ভারতীয়র, আহত হয়েছিলেন প্রায় ১০০০-এরও বেশি মানুষ। বেসরকারি হিসেব অনুযায়ী মৃতের সংখ্যা ছিল কয়েক হাজারের বেশি৷ ১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিলের এই ঘটনা ভারতের ইতিহাসকে বদলে দিয়েছিল।

এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ইংরেজদের প্রকৃত রূপ প্রকাশ পায় সকলের সামনে। খবর পান রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ঘটনা শোনার পর তিনি মনে করেছিলেন ইংরেজদের এই বর্বরোচিত আচরণ সারা বিশ্বের মানুষের কাছে তুলে ধরা উচিত। এরপরই তিনি সিদ্ধান্ত নেন তার নাইটহুড উপাধি ত্যাগের মাধ্যমেই প্রতিবাদ করবেন। গান্ধীজিকে তার এই প্রস্তাবের কথা চিঠি লিখে জানালে তিনি পরিষ্কার বলে দেন, ”আই ডু নট ওয়ান্ট টু এম্বারাস দ্য গভর্নমেন্ট নাউ”। এই কথাতে কবিগুরু আঘাত পেলেন, এরপর গেলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের কাছে। চিত্তরঞ্জন দাশ সহ কোনও কংগ্রেস নেতাই পাশে দাঁড়ায়নি রবীন্দ্রনাথের। তাই, তিনি একাই সিদ্ধান্ত নিলেন তার উপাধি ত্যাগের মাধ্যমে প্রতিবাদ জানাবেন এই অমানবিক ঘটনার বিরুদ্ধে। ১৯১৯ সালের ২৯ এপ্রিল ইংরেজদের কাছে নাইটহুড ত্যাগের চিঠি পাঠালেন তিনি, যা কালের যাত্রায় প্রতিবাদ জানাবার এক ঐতিহাসিক দলিল হয়ে রয়েছে। স্যালুট রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর!

ব্রিটিশ বিরোধী ভারতবর্ষের স্বাধীনতার লড়াই সংগ্রামে জালিয়ানওয়ালাবাগের সমাবেশে নির্বিচারে গুলিবর্ষণে শহীদদের আমরা ভুলবোনা কোনদিন। সকল শহীদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা ও অভিবাদন!!

পরিশেষে শেষ করছি, বাংলা সাহিত্যের অন্যতম দিকপাল ও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের আরেকটি কবিতা দিয়ে।

‘সাম্যবাদী’
– কাজী নজরুল ইসলাম

গাহি সাম্যের গান-
যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান
যেখানে মিশছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুস্লিম-ক্রীশ্চান।
গাহি সাম্যের গান!
কে তুমি?- পার্সী? জৈন? ইহুদী? সাঁওতাল, ভীল, গারো?
কন্ফুসিয়াস্? চার্বআখ চেলা? ব’লে যাও, বলো আরো!
বন্ধু, যা-খুশি হও,
পেটে পিঠে কাঁধে মগজে যা-খুশি পুঁথি ও কেতাব বও,
কোরান-পুরাণ-বেদ-বেদান্ত-বাইবেল-ত্রিপিটক-
জেন্দাবেস্তা-গ্রন্থসাহেব প’ড়ে যাও, যত সখ-
কিন্তু, কেন এ পন্ডশ্রম, মগজে হানিছ শূল?
দোকানে কেন এ দর কষাকষি? -পথে ফুটে তাজা ফুল!
তোমাতে রয়েছে সকল কেতাব সকল কালের জ্ঞান,
সকল শাস্র খুঁজে পাবে সখা, খুলে দেখ নিজ প্রাণ!
তোমাতে রয়েছে সকল ধর্ম, সকল যুগাবতার,
তোমার হৃষয় বিশ্ব-দেউল সকল দেবতার।
কেন খুঁজে ফের’ দেবতা ঠাকুর মৃত পুঁথি -কঙ্কালে?
হাসিছেন তিনি অমৃত-হিয়ার নিভৃত অন্তরালে!

বন্ধু, বলিনি ঝুট,
এইখানে এসে লুটাইয়া পড়ে সকল রাজমুকুট।
এই হৃদ্য়ই সে নীলাচল, কাশী, মথুরা, বৃন্দাবন,
বুদ্ধ-গয়া এ, জেরুজালেম্ এ, মদিনা, কাবা-ভবন,
মস্জিদ এই, মন্দির এই, গির্জা এই হৃদয়,
এইখানে ব’সে ঈসা মুসা পেল সত্যের পরিচয়।
এই রণ-ভূমে বাঁশীর কিশোর গাহিলেন মহা-গীতা,
এই মাঠে হ’ল মেষের রাখাল নবীরা খোদার মিতা।
এই হৃদয়ের ধ্যান-গুহা-মাঝে বসিয়া শাক্যমুনি
ত্যজিল রাজ্য মানবের মহা-বেদনার ডাক শুনি’।
এই কন্দরে আরব-দুলাল শুনিতেন আহবান,
এইখানে বসি’ গাহিলেন তিনি কোরানের সাম-গান!
মিথ্যা শুনিনি ভাই,
এই হৃদয়ের চেয়ে বড় কোনো মন্দির-কাবা নাই।

লেখক: মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট

সারাবাংলা/এসবিডিই

মুক্তমত রবীন্দ্রনাথের ‘নাইট’ খেতাব বর্জনের ১০৫ বছর সৈয়দ আমিরুজ্জামান

বিজ্ঞাপন
সর্বশেষ

ইউনিয়ন পরিষদ বাতিলের আহ্বান বিএনপির
২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ২২:৪৫

সম্পর্কিত খবর